এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সংকটের মধ্যেও ইরান এখনও প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হরমুজ প্রণালিতে জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হলেও ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থেমে যায়নি; বরং দেশটি নিজেদের কৌশলগত অবস্থান, নৌপথ ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি কাঠামো ব্যবহার করে তেল পরিবহন চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) বহুদিন ধরেই হরমুজকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন chokepoint হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে, আর সাম্প্রতিক অস্থিরতায় সেই গুরুত্ব আরও সামনে এসেছে। এ প্রণালিতে যেকোনো বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
রয়টার্সের ১১ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ইরান প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। হিসাব করলে দৈনিক রপ্তানি দাঁড়ায় আনুমানিক ১১ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেলের মধ্যে। এই পরিমাণ ২০২৫ সালের গড় রপ্তানি প্রবণতার কাছাকাছি। অর্থাৎ যুদ্ধাবস্থা ও নৌ-সংকট সত্ত্বেও ইরান তার তেল রপ্তানির প্রধান ধারা ধরে রাখতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে মূলত কয়েকটি কারণে। প্রথমত, দেশটি হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বা প্রভাববলয়ের জলসীমা ঘেঁষে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করছে, যাতে প্রতিপক্ষের বাধা বা হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমে। দ্বিতীয়ত, ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ এখনো কার্যকর রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার খবর এসেছে, তবু তেল অবকাঠামো পুরোপুরি অচল হয়নি এবং সেখান থেকে রপ্তানি অব্যাহত আছে বলে জানানো হয়েছে। খারগ দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ ওপেক-সম্পর্কিত তেল চালান হয়।
ইরানের পার্লামেন্টের জ্বালানি কমিশনের এক মুখপাত্রও দাবি করেছেন, দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি “বাধাহীনভাবে” চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, খারগ দ্বীপে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং তেল খাতে বড় ধরনের থেমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরকারি বক্তব্য সব সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, তবু স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও দেখাচ্ছে যে ইরানি তেলের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, একই সময়ে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ হরমুজ হয়ে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার কারণে বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও স্থলভিত্তিক পাইপলাইন দিয়ে রপ্তানি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিপরীতে ইরান তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে হলেও প্রণালি দিয়েই নিজের তেল পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বর্তমান সংকটে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে—যে প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইরান, সেই পথ দিয়েই আবার ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থান বরাবরই কৌশলগত। দেশটি একদিকে এ পথকে ভূ-রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, অন্যদিকে নিজের অর্থনীতির প্রধান লাইফলাইন হিসেবেও ধরে রাখে। কারণ তেল রপ্তানি ইরানের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম বড় উৎস। কঠোর নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তেল বিক্রি দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখছে। বিশেষ করে চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতাদের একজন হিসেবে বিবেচিত।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে অচল বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ইরানসহ কিছু তেল প্রবাহ এখনো চলমান থাকায় বাজারে সম্পূর্ণ বিপর্যয় নেমে আসেনি। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যদি খারগ দ্বীপের অবকাঠামো বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন ধাক্কা লাগতে পারে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু কিছু তেলবাহী জাহাজ আবার চলাচল শুরু করেছে, যদিও তা এখনও খুব সীমিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ সামুদ্রিক বাস্তবতায় পুরোপুরি স্থবিরতা নেই, তবে স্বাভাবিক অবস্থাও ফেরেনি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরানের রপ্তানি সক্ষমতা বজায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা, সামরিক হামলা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এখনও প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। এটি শুধু ইরানের অর্থনৈতিক সহনশীলতারই ইঙ্গিত নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দেশটির প্রভাব কতটা গভীর—সেটিও আবার সামনে এনে দিয়েছে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের তেল রপ্তানি আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
Social Plugin