বাংলাদেশের একমাত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: FM-90
বিশেষ প্রতিবেদন | প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬
ভূমিকা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন বহুস্তরীয় (multi-layered) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও নির্ভর করছে মাত্র একটি সিস্টেমের উপর — FM-90 স্বল্পপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম (SAM)। মাত্র ৮ থেকে ১৫ কিলোমিটার কার্যকর পাল্লার এই চীনা-নির্মিত ব্যবস্থাটিকে নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
FM-90 কী এবং কোথা থেকে এলো?
FM-90 মূলত চীনের China Precision Machinery Import-Export Corporation (CPMIEC)-এর তৈরি একটি স্বল্পপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম। এটি সোভিয়েত Crotale ক্ষেপণাস্ত্রের অনুকরণে তৈরি বলে ধারণা করা হয়, এবং মূলত স্বল্প উচ্চতায় উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার ও কিছু ক্রুজ মিসাইলকে প্রতিরোধ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই সিস্টেমটি চীন থেকে সংগ্রহ করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা আর্টিলারি শাখা এটি পরিচালনা করে থাকে।
FM-90-এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | তথ্য |
|---|---|
| নির্মাতা | CPMIEC, চীন |
| ধরন | স্বল্পপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল |
| কার্যকর পাল্লা | ৮ – ১৫ কিলোমিটার |
| সর্বোচ্চ উচ্চতা | ৬,০০০ মিটার (প্রায়) |
| মিসাইলের ধরন | রেডার-গাইডেড, অ্যাক্টিভ হোমিং |
| লক্ষ্যমাত্রা | যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ক্রুজ মিসাইল |
| মোবিলিটি | মোবাইল (চাকায় চলমান) |
| প্রতিটি ইউনিটে মিসাইল | ৮টি (লঞ্চার প্রতি) |
কীভাবে কাজ করে FM-90
FM-90 সিস্টেমে একটি সার্চ রেডার, একটি ট্র্যাকিং রেডার এবং একাধিক মিসাইল লঞ্চার থাকে। শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্ত হওয়ার পর সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে টার্গেট লক করে এবং মিসাইল নিক্ষেপ করে। মিসাইলটি সেমি-অ্যাক্টিভ রেডার হোমিং পদ্ধতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।
এটি একটি পয়েন্ট ডিফেন্স সিস্টেম — অর্থাৎ এটি একটি নির্দিষ্ট স্থান বা স্থাপনা রক্ষা করতে পারে, কিন্তু বিস্তৃত আকাশসীমার নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়।
কেন এটি উদ্বেগের কারণ?
১. সীমিত পাল্লা
মাত্র ১৫ কিলোমিটার পাল্লা আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অপ্রতুল। আধুনিক যুদ্ধবিমান শত শত কিলোমিটার দূর থেকে এয়ার-লঞ্চড মিসাইল ছুঁড়তে সক্ষম, যার মানে FM-90 সেগুলো রেঞ্জেই পাবে না।
২. ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরোধের অক্ষমতা
FM-90 ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অকার্যকর। আধুনিক হুমকিতে ব্যালিস্টিক মিসাইল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা প্রতিরোধে বাংলাদেশের কোনো সক্ষমতা নেই।
৩. একক স্তরের প্রতিরক্ষা
উন্নত দেশগুলো সাধারণত তিনটি স্তরে আকাশ প্রতিরক্ষা পরিচালনা করে — দূরপাল্লা, মধ্যম পাল্লা এবং স্বল্পপাল্লা। বাংলাদেশে কেবল স্বল্পপাল্লার একটি সিস্টেম থাকায় প্রতিরক্ষা কাঠামো একেবারেই একমাত্রিক।
৪. পুরনো প্রযুক্তি
FM-90 তুলনামূলকভাবে পুরনো প্রযুক্তির সিস্টেম। আধুনিক স্টিলথ বিমান বা হাইপারসনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
৫. সীমিত কভারেজ
১৬১,০০০ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে যে সংখ্যক এবং যে ধরনের সিস্টেম দরকার, FM-90-এর সংখ্যা ও পাল্লা তার কাছাকাছিও নয়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা
বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো অনেক বেশি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সজ্জিত:
- ভারত: S-400 (রাশিয়া), Akash মিসাইল সিস্টেম, Barak-8 এবং বহু স্বল্পপাল্লার SAM দিয়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে।
- মিয়ানমার: BUK-M1, Pechora সহ একাধিক সিস্টেম ব্যবহার করে।
- পাকিস্তান: HQ-9 (চীনা S-300 সমমানের), Spada-2000, LY-80 সহ বিভিন্ন স্তরের সিস্টেম।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, FM-90 বর্তমানে কেবল রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম বন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির মতো নির্দিষ্ট কিছু স্থাপনার "পয়েন্ট ডিফেন্স" হিসেবে কাজ করতে পারে — পুরো দেশের আকাশ রক্ষা এটির পক্ষে সম্ভব নয়।
অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের মধ্যম পাল্লার একটি SAM সিস্টেম — যেমন চীনের HQ-16 বা রাশিয়ার Buk-M2 — অর্জন করা এখন সময়ের দাবি।
সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশ সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী গত কয়েক বছরে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য MiG-29 এবং পরবর্তীতে F-7BG যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করা হয়েছে। স্থল বাহিনীর কিছু আধুনিকায়নও হয়েছে।
তবে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ বা নতুন SAM সিস্টেম সংগ্রহের বিষয়ে এখনও কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি। সীমিত বাজেট ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এই বিলম্বের অন্যতম কারণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক কেন?
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে — ভারত, মিয়ানমার এবং বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে। রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ এবং সীমান্তে মাঝে মাঝে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
FM-90 বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি আধুনিক আকাশ হুমকির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত নয়। একটি মাত্র স্বল্পপাল্লার SAM সিস্টেমের উপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের কৌশলগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আগামী দশকে বাংলাদেশকে অন্তত একটি মধ্যম পাল্লার SAM সিস্টেম, একটি দূরপাল্লার আর্লি ওয়ার্নিং রেডার নেটওয়ার্ক এবং SHORAD (Short-Range Air Defense) আধুনিকায়নে মনোযোগ দিতে হবে — তা না হলে আকাশ প্রতিরক্ষার এই শূন্যতা দেশের জন্য একটি কৌশলগত ঝুঁকি হয়েই থাকবে।
.png)
Social Plugin